স্টিভ জোবসঃ টেকনোলজির জগতে আলোরণ সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তিত্ব!

0
867

টেকনোলজির জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম হলো স্টিভ জোবস।তাঁর কাজ টেকনোলজি জগতের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।তাঁর ছোঁয়ায় কম্পিউটার হয়ে উঠেছিল স্টাইলিস।বর্তমান যুগে যেই অ্যাপেলের ডিভাইসকে কেন্দ্র করে মানুষের এত উন্মাদনা সেই অ্যাপল কোম্পানির প্রধান কান্ডারী হলেন আমেরিকার প্রবল প্রতাপশালী শিল্পপতি এবং উদ্ভাবক স্টিভ জোবস। আইপড, আইপ্যাড, ম্যাকবুক ইত্যাদির মতো উন্নত টেকনোলজির উদ্ভাবনের জন্য বর্তমানে তাঁর নাম সারা বিশ্বের কাছেই পরিচিত।

শুরুর জীবন

স্টিভ জোবসের জীবনের শুরুটা মোটেই মসৃন ছিল না।বহু কন্টকবহুল পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল তাঁকে সম্মান ও বৈভবের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য।১৯৫৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করার পরই তাঁর জন্মদাত্রী পিতা-মাতা তাঁকে ত্যাগ করেন এবং তাঁর পরবর্তীতে তাঁকে দত্তক নেন পল এবং ক্লারা জোবস।স্টিভ জোবস সারা জীবল পল এবং ক্লারা জোবসকেই নিজের পিতা-মাতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন।স্টিভ জোবসের পুরো ছেলেবেলাই কেটে গেছে তাঁর পিতামাতার খোঁজ করতে করতে।

ছোটোবেলায় পল জোবস তাঁর পুত্রকে ইলেক্ট্রনিকস জিনিসপত্র নিয়ে তাদের গ্যারেজে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে উৎসাহ যোগাতেন।এই উৎসাহই স্টিভের মনে ইলেক্ট্রনিকস এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ডিজাইনের ওপর আকর্ষন জাগিয়ে তুলেছিল।

ছাত্র হিসাবে ভীষনই মেধাবী ছিলেন স্টিভ জোবস। কিন্তু তবুও বাঁধাধরা নিয়মের এই পড়াশোনা তাঁর কখনোই ভালো লাগতো না।তাঁর পড়াশোনা প্রায় বেশীরভাগটাই হয় ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।কলেজে পড়াকালীনই স্টিভ আকর্ষিত হয়ে পড়েন ক্যালিগ্রাফী কোর্সের দিকে।পরবর্তীকালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছে অ্যাপল ডিভাইসের ফন্টের স্টাইল এবং টাইপ ফেসের আইডিয়া তাঁর জীবনের এই কোর্স থেকেই উদ্ভাবিত।

ভারতের সাথেও আছে তাঁর অতীতের টান

১৯৭৪ সালে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের খোঁজে ড্যানিয়েল কোটকের সাথে স্টিভ জোবস পা রাখের ভারতের মাটিতে।ভারতে তারা একটি আশ্রমে থাকতে শুরু করেন।বৌদ্ধ ধর্ম এবং প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক দর্শন সম্বন্ধে তিনি গভীর জ্ঞান লাভ করেন ভারত থেকে।পরবর্তীকালে তিনি জানিয়েছেন যে এই সংস্কৃতির বৈপরীত্ত তাঁকে জীবন এবং তাঁর ব্যবসার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী আরও বিস্তৃত করে তুলতে সাহায্য করেছে।

স্টিভ জোবসের প্রথম কম্পিউটারের চাকরি এসেছিল ‘আটারি কম্পিউটার’ কোম্পানির তরফ থেকে।এখানেই স্টিভ জোবসের সাথে দেখা হয় স্টিভ ওয়াজনিয়াকের।জোবস তাঁর সারাজীবনে এই বিখ্যাত কম্পিউটার টেকনিশিয়ানকে ভীষনভাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে গেছেন।

স্টিভ জোবস এবং অ্যাপেলের কাহিনী

১৯৭৬ সালে ওয়াজনিয়াক প্রথম আবিষ্কার করেন অ্যাপেল ওয়ান কম্পিউটার।এরপর জোবস, ওয়াজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়ানে মিলে সেট আপ করেন অ্যাপেল কম্পিউটারস।শুরুর দিকে অ্যাপেলের কম্পিউটার বিক্রি হতো স্টিভ জোবসের বাবা-মায়ের গ্যারেজ থেকে।

এরপরে টেকনোলজির মার্কেটে হোম কম্পিউটারে চাহিদা বাড়লে অ্যাপেল কম্পিউটারের ব্যবসাও দ্রুত গতিতে বেড়ে উঠতে থাকে।

১৯৮৪ সালে জোবস আবিষ্কার করে ফেলেন প্রথম ম্যাকিনটস।এটি হলো সর্বপ্রথম ব্যবসায়িকভাবে সফল হোম কম্পিউটার যেটিতে ব্যবহার করা হয়েছিল গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস।হোম কম্পিউটিং-এর জগতে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলস্টোন।পরবর্তীকালে এটি হয়ে দাঁড়ালো হোম কম্পিউটার প্রিন্সিপালের প্রধান বিষয়।

অ্যাপেল কোম্পানিতে জোবসের অসাধারণ কৃতিত্বের সমস্ত নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও অ্যাপেল কোম্পানির অন্যান্য কর্মীদের সাথে স্টিভ জোবসের বিরোধ বাঁধে।এরপর ১৯৮৫ সালে স্টিভ জোবস নিজে থেকেই ত্যাগ করেন অ্যাপেল কোম্পানিকে।তিনি পরবর্তীকালে বলেছিলেন অ্যাপেল কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনাটা তাঁর জীবনের সবথেকে ভালো ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি।অ্যাপেল কোম্পানি থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করার স্বাধীনতা, ফিরে পেয়েছিলেন নিজে থেকে নতুন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করার সুযোগ।

অ্যাপেল কোম্পানির পরবর্তী জীবন

অ্যাপেল কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসার পর স্টিভ জোবস আবিষ্কার করলেন NeXT কম্পিউটার।তবে এই আবিষ্কার বিশেষ সফল হলো না এবং ব্যবসাও পেল না।তবে ১৯৯০-এর দশকে NeXT সফটওয়্যার ব্যবহার হয় অ্যাপেল স্টোর এবং আইটিউন স্টোরের ওয়েবঅবজেক্টের ফ্রেমওয়ার্ক হিসাবে।১৯৯৬ সালে অ্যাপেল ৪২৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যে কিনে নেয় এই NeXT সফটওয়্যারকে।

জোবসের NeXT সফটওয়্যার ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে অসফল হলেও তাঁর কম্পিউটার গ্রাফিক ফ্লিম প্রোডাকশন কোম্পানি ‘পিক্সার’ ভীষনভাবে সফল হয়েছিল।‘টয় স্টোরি’, ‘এ বাগস লাইফ’ এবং ‘ফাইন্ডিং নিমো’ ইত্যাদি অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরী করার জন্য ডিজনি কন্ট্রাক্ট করে পিক্সারের সাথে এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই ফিল্মগুলো কতটা জনপ্রিয় হয়েছিল।এই অ্যানিমেশন ফিল্মগুলোই জোবসকে সফলতা এবং শ্রদ্ধার চূড়ায় উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করেছিল।

১৯৯৬ সালে NeXT সফটওয়্যারের মাধ্যমে জোবস আবার ফিরে আসে অ্যাপেলে।সেইসময় মাইক্রোসফটের সাথে ব্যবসায়িক প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়েছিল অ্যাপেল।এমনই একসময়ে জোবসকে এই কোম্পানিতে দেওয়া হয় চিফ এক্সিকিউটিভের পোস্ট।

অ্যাপেলে প্রত্যাবর্তন

জোব অ্যাপেলে ফিরে এসে কোম্পানিকে এর নতুন দিকে চালিত করতে শুরু করেন।তিনি প্রথমেই অ্যাপেল কোম্পানির কয়েকটি প্রোজেক্টকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেন।তার পরিবর্তে তিনি অ্যাপেলের প্রোডাক্টগুলোকে ব্যবহারে সহজ এবং আধুনিক ডিজাইনে নতুনভাবে সাজানোর দিকে মনোযোগ দিলেন।তার সাথে সাথে অ্যাপেলের ডিভাইসগুলোতে নতুনত্ব ফিচারের প্রবর্তন করতে শুরু করলেন।

জোবসের অধীনে অ্যাপেলের প্রথম অসাধারন ঐতিহাসিক প্রোডাক্ট হলো আইপড।যেটি পোর্টেবল মিউজিক ডিভাইসের স্ট্যান্ডার্ডকে এক অন্য উচ্চতায় তুলে দিয়েছিল।এরপর ২০০৮ সালে এলো আইটিউন, যেটি কিনা মার্কিন বাজারে দ্বিতীয় সংগীত ব্যবসায়ী।

এরপর ২০০৭ সালে অ্যাপেল সফলভাবে ঢুকতে পারে মোবাইল ফোনের মার্কেটে এবং বাজারে আসে বিখ্যাত আইফোন।অ্যাপেলই সর্বপ্রথম বাজারে নিয়ে এলো এইধরনের মাল্টিফাঙ্কশনাল টাচ স্ক্রিন ডিভাইস।ধীরে ধীরে আইফোন হয়ে উঠলো সবচেয়ে বেশী বিক্রিযোগ্য ইলেক্ট্রনিকস ডিভাইস।ঠিক এরপরেই ২০১০ সালে জোবস অ্যাপেলের তরফ থেকে বাজারে নিয়ে এলো আরেক বিস্ময় যার নাম আইপ্যাড।এসে গেলো ইতিহাসের নতুন স্টাইলের ট্যাবলেট কম্পিউটার।

জোবের নেতৃত্বে অ্যাপেল আবার হয়ে উঠলো আমেরিকার একনম্বর প্রশংসিত কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীক প্রতিযোগিতায় মাইক্রোসফটকে পেছনে ফেলে আবার এগিয়ে যেতে শুরু করলো স্বমহিমায়।

ব্যক্তিগত জীবন

১৯৯১ সালে স্টিভ জোবস আবদ্ধ হন বিবাহ বন্ধনে।লোরেন পাওয়েলের সাথে তিনি শুরু করেন তাঁর নিজস্ব সংসার।পাওয়েলো এবং জোবসের ছিল তিনটি সন্তান।তাঁরা বাস করতেন ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে।

তবে জোবসের জীবনে আবার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে ২০০৩ সালে।এই বছরে তাঁর ধরা পড়ে প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার।এরপর থেকে শুরু হয় জোবসের প্রবল শারিরীক যুদ্ধ।২০০৯ সালে তাঁর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানো হয় কিন্তু তাঁর দুইবছর পর আবার জটিল শারিরীক সমস্যা ঘিরে ধরে জোবস কে। তবুও ২০১১ সাল অবদি তিনি মাঝে মাঝে অ্যাপেলের হয়ে কাজ করে গেছেন।কিন্তু অবশেষে ভীষনভাবে শারিরীক অবনতির কারণে তিনি পুরোপুরিভাবে অবসর নিয়ে নেন অ্যাপেল থেকে।প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার আরও জটিল রূপ ধারন করায় এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় ২০১১ সালে ৫ই অক্টোবর তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

স্টিভ জোবস টেকনোলজির জগতে এক বিশাল ব্যক্তিত্ব।তাঁর প্রতি সম্মান জ্ঞাপনের জন্য প্রত্যেক বছর ১৬ই অক্টোবরে উদযাপন করা হয় স্টিভ জোবস দিবস।বিশ্বের টেকনোলজিতে আজ যেই সমস্ত ডিভাইস নিয়ে আমাদের রোজকার দিন অতিবাহিত হয় তাঁর সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে এই ব্যক্তির অবদান।এই পৃথিবীতে টেকনোলজি যতদিন থাকবে স্টিভি জোবসের নামও সোনার অক্ষরে ততদিন লেখা থাকবে।

Leave a Reply