মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা

0
1210
bengali language movement

আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আজকের দিনে বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে বহু শহিদ নিজের প্রাণের বিনিময়ে এই ভাষার জন্য লড়েছিলেন। তাদের রক্তে পরিশুদ্ধ হয়ে পূণর্জন্ম নিয়েছিল বাংলা ভাষা। আজ সেই পূণ্যদিনে সেই বাংলা ভাষার অতীতকে একটু ফিরে দেখা যাক।

ভাষা বহতা নদীর মতো। প্রবাহমানতা ও পরিবর্তনশীলতা তার প্রধান বৈশিষ্ট। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের ‘ভারতীয় আর্য’ শাখাটি খ্রীষ্ট জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে অনুপ্রবিষ্ট হয়। আজকের বাংলাভাষাকে এই ভারতীয় আর্যভাষার সুদূর বংশধর বলা চলে। ভারতীয় আর্যভাষার ইতিহাস তিনটি প্রধান যুগে বিভক্ত – প্রাচীন ভারতীয় আর্য (OIA), মধ্যভারতীয় আর্য (MIA) এবং নব্যভারতীয় আর্য। একশ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ছয়শো খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে মধ্যভারতীয় আর্যভাষার কয়েকটি আঞ্চলিক রূপ পাওয়া গেল যার মধ্যে ছিল, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত। মাগধী প্রাকৃত ও অর্ধমাগধী প্রাকৃত। মাগধী প্রাকৃতের পরবর্তীস্তর মাগধী অপভ্রংশ-অবহটঠ থেকেই আনুমানিক ৯০০ খ্রীষ্টাব্দ বা তার কাছাকাছি সময়ে জন্ম হয়েছে বাংলা ভাষার, যা আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃত এবং ভারতের পশ্চিববঙ্গ সহ আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খন্ডের নানা অংশে প্রচলিত। সর্বোপরী ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এই ভাষাতেই রচিত হয়েছে।

বিস্তারঃ

ভাষা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ‘এথনোলগ’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলা ভাষায় ভাববিনিময়কারী মানুষের সংখ্যা এখন ছাব্বিশ কোটির বেশী। যারা ভারত বাংলাদেশ ছাড়াও ছড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, চীন, কোরিয়া, মালয়েশিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রের নানা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাকেন্দ্র বাংলা ভাষার চর্চা ও গবেষনাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে। মাতৃভাষা হিসাবে বিশ্বভাষা তালিকার পঞ্চম স্থানে এবং বহুল ব্যবহৃত ভাষা হিসাবে সপ্তম স্থান অধিকার করে রয়েছে বাংলা ভাষা।

বিবর্তনঃ

দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত চর্যাপদকে বাংলা ভাষার আদিযুগের প্রধান নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়। এরপর শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলীসহ নানা সাহিত্য ধারার হাত ধরে সমৃদ্ধ হতে হতে মধ্যযুগীয় কালসীমা অতিক্রম করে আধুনিক যুগে পা রেখেছে বাংলাভাষা অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে, যেই যুগধারা আজও বহমান। এই পর্বেই প্রতিষ্ঠিত হল সাহিত্যিক বাংলা গদ্য। এই সুদীর্ঘ বিবর্তন পথে স্পষ্ট হয়েছে কথ্য বাংলার আঞ্চলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপগুলি। এই রূপগুলো হলো- রাঢ়ী, বঙ্গালী, বরেন্দ্রী, কামরূপী বা রাজবংশী এবং ঝাড়খন্ডী।

স্বীকৃতিঃ

এই ভাষায় রচিত সাহিত্য কর্মের অনুবাদ সূত্রেই প্রথম নোবেল পুরষ্কার এসেছে ভারতবর্ষে। এই ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে ঘটেছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এই সংগ্রামে বাংলা ভাষার জন্য শহিদ হয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত সহ আরো অনেকে। ১৯৬১ সালে অসমের বরাক উপত্যকার মাটিও রক্ত রঞ্জিত হয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৯ খ্রীষ্টাব্দের সতেরোই নভেম্বর ইউনেস্কো (UNESCO) ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী প্রত্যেক মানুষের কাছে অত্যন্ত গৌরবের ও আনন্দের। 

লেখনী: অজন্তা চ্যাটার্জী

Leave a Reply