সিগন্যাল অ্যাপ কি হোয়াটসঅ্যাপের যোগ্য বিকল্প? জেনে নিন বিস্তারিত

0
1142
signalapp-vs-whatsapp

সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি পলিসিতে কিছু পরিবর্তন আসার কারনে অনেক ব্যবহারকারীই হোয়াটসঅ্যাপ ত্যাগ করে সিগন্যাল অ্যাপকে বেঁছে নিচ্ছেন নিজের প্রাইভেট চ্যাট অ্যাপ হিসাবে। কিন্তু সিগন্যাল অ্যাপ কি সত্যিই সুরক্ষিত? আজকের পোস্টে সেই বিষয়েই নিয়ে আসা হলো সমস্ত তথ্য।

সিগন্যাল অ্যাপ বহু আগে থেকেই হোয়াটসঅ্যাপের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ তাদের প্রাইভেসি পলিসিতে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসার দরুন এই সিগন্যাল অ্যাপ-এর চাহিদা ব্যবহারকারীদের মধ্যে হঠাত করে বেড়ে গেছে। কিন্তু এই অ্যাপ সম্বন্ধে অনেক ব্যবহারকারীই বিশেষ কিছু জানেন না। ফলতই এই অ্যাপ ব্যবহার করা সুরক্ষিত হবে কিনা সেই বিষয়ে অনেকেই আছেন বিশেষ দ্বন্দ্বে। আজ বিশেষত সেই কারনেই আজকের পোস্টে বিস্তারিত ভাবে খোঁজ নেওয়া হলো যে চ্যাট অ্যাপ হিসাবে সিগন্যাল অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের যথাযোগ্য বিকল্প কিনা।

এই সিগন্যাল অ্যাপটি তাঁর নিজস্ব ‘ওপেন-সোর্স সিগন্যাল প্রোটোকল’ ব্যবহার করে এর ব্যবহারকারীদের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড যোগাযোগের সুবিধা করে দেয়। অ্যান্ড্রয়েড, PC এবং iOS ব্যবহারকারীরা এই অ্যাপ ব্যবহার করে নিশ্চিন্তে এনক্রিপটেড টেক্সট, গ্রুপ চ্যাট, ভয়েস মেসেজ, ছবি এবং ভিডিও-এর মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। সিগন্যাল অ্যাপের অ্যান্ড্রয়েড ভার্সনটি এমনকি ফোনের SMS এবং MMS অ্যাপ হিসাবেও ব্যবহার করা যায়। তবে এই ক্ষেত্রে কিন্তু টেক্সট মেসেজগুলো এনক্রিপটেড থাকবে না। এই অ্যাপের মোবাইল ভার্সনে ভিডিও কল এবং ভয়েস কলও এনক্রিপটেড থাকে। তবে এর আগে এই অ্যাপের আইপ্যাড এবং কম্পিউটার ভার্সনে ভয়েস কল এবং ভিডিও কলের সুবিধা ছিল না। তবে ২০২০ সালের অক্টোবর মাস থেকে সেই সুবিধাও শুরু হয়ে গেছে।

আজকের পোস্টে আলোচিত বিষয়গুলো হলোঃ

সিগন্যাল অ্যাপ কি?

সিগন্যাল অ্যাপ কী কী ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে?

কতজন ব্যবহারকারী এই অ্যাপটি ব্যবহার করে থাকে?

সিগন্যাল অ্যাপ কী সত্যিই সুরক্ষিত?

সিগন্যাল অ্যাপ থেকে কি ঠকবার কোনো সম্ভবনা আছে?

সিগন্যাল অ্যাপটিও কী ফেসবুকের আয়ত্তাধীন?

সিগন্যাল অ্যাপ কি?

সিগন্যাল অ্যাপ সম্বন্ধে জানার আগেই, সমস্ত ব্যবহারকারীর মনে যেই প্রশ্নটি প্রথমেই উকি দেয় সেটি হলো, এই অ্যাপটি বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কিনা? হ্যাঁ, সিগন্যাল অ্যাপটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই ব্যবহারকারীরা ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন। এটি আসলে, Android, ios, এবং ডেস্কটপের জন্য একটি ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন যা এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন নিয়োগ করে ব্যবহারকারীর কথোপকথনকে সুরক্ষিত রাখে। যদিও সিগন্যাল অ্যাপটি যোগাযোগ করার জন্য মাধ্যম হিসাবে ফোন নম্বর ব্যবহার করে থাকে। এই অ্যাপ ব্যবহার করে করা কল এবং বার্তা গুলি আসলে ব্যবহারকারীর ডাটা সংযোগ ব্যবহার করে এনক্রিপ্টেড করা হয়ে থাকে। তাই এই অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে, কথোপকথনের উভয় পক্ষের মোবাইল ডিভাইসে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস থাকতে হবে। আগেও বলা হয়েছে যে, Android ফোনে সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহারকারীর ডিফল্ট টেক্সট মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন হিসাবেও কাজ করতে পারে। তাই সিগন্যালের মধ্যে এসএমএস বার্তাও পাঠানো সম্ভব। এই এসএমএস মেসেজ ব্যবহারকারীর মোবাইল প্ল্যানের মাধ্যমে যায় এবং ব্যবহারকারিকে এই মেসেজের জন্য অর্থ খরচ করতে হয় সাধারন মেসেজের মতই।

সিগন্যাল অ্যাপ কী কী ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে?

সিগন্যাল অ্যাপটি সহজেই অ্যান্ড্রয়েড, iOS এবং কম্পিউটার প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারীরা যেই সমস্ত সুবিধা হোয়াটসঅ্যাপে পেতেন সেই সমস্ত সুবিধা এই অ্যাপেও পেতে সক্ষম হবেন। ব্যবহারকারীরা এই অ্যাপ ব্যবহার করে নিশ্চিন্তে এনক্রিপটেড টেক্সট, গ্রুপ চ্যাট, ভয়েস মেসেজ, ছবি এবং ভিডিও-এর মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন। পারতপক্ষে এটি বলাই যায় যে সিগন্যাল অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষিত।

কতজন ব্যবহারকারী এই অ্যাপটি ব্যবহার করে থাকে?

সিগন্যাল ফাউন্ডেশন এখনো পর্যন্ত প্রকাশ করেনি যে এই অ্যাপটির কতজন দৈনিক বা মাসিক ব্যবহারকারী আছে। তবে গুগল প্লে স্টোর তালিকার মাধ্যমে জানা গেছে যে, সিগন্যাল অ্যাপের Android সংস্করণ ১০ মিলিয়ন বার ডাউনলোড করা হয়েছে। অতএব এটি বলাই যে, বেশ অনেক পরিমান ব্যবহারকারীই এই অ্যাপ ব্যবহার করে থাকে।

সিগন্যাল অ্যাপ কী সত্যিই সুরক্ষিত?

এই অ্যাপে শুধু মাত্র ব্যবহারকারীর ফোন নম্বর ব্যবহারকারীর ডাটা হিসাবে সেভ করা থাকবে। বার্তা এনক্রিপ্ট করা ছাড়াও, সিগন্যাল সার্ভিস আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মেটাডাটা লুকিয়ে রাখে, সেটি হলো কে কাকে মেসেজ করছে সেটি খুঁজে বের করা যায় না। এই অ্যাপে আছে ‘সিলড সেন্ডার’ ফিচার , এই ফিচারের মাধ্যমেই অ্যাপটি প্রেরক এবং প্রাপকের বিস্তারিত বিবরণ লুকিয়ে রাখে। সিগন্যাল অ্যাপ ব্যবহারকারীকে তার সার্ভারে ভয়েস কল ‘রিলে’ করার অনুমতি দেয়, যার ফলে অন্যান্য যোগাযোগ থেকে ব্যবহারকারীর পরিচয় লুকিয়ে থাকে। ব্যবহারকারীরা এছাড়াও এই অ্যাপের মাধ্যমে ইনকগনিটো কীবোর্ড মোড সক্রিয় করতে পারেন এবং অ্যাপের মধ্যে স্ক্রীনশট ব্লক করতে পারেন। সম্প্রতি, এই অ্যাপ ছবি পাঠানোর আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুখ ঝাপসা করার জন্য একটি বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে। সিগন্যাল অ্যাপ বলছে যে এটি এছাড়াও নির্ধারণ করতে পারে যে একজন ব্যবহারকারীর ঠিকানা সেই অ্যাপের ব্যবহারকারীর কিনা। তবে ঠিকানা সংক্রান্ত কোনো তথ্যই এই অ্যাপ বাইরে প্রকাশ করে না।

সিগন্যাল অ্যাপ থেকে কি ঠকবার কোনো সম্ভবনা আছে?

হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি পলিসিতে পরিবর্তন আসলতেই অনেক হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর যেই উদ্বেগ প্রথমেই উত্থাপিত হয় সেটি হলো যে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছে, এবং এটা ফেসবুকের কাছে মূল্যবান, তাই সেটি ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপের কাছ থেকে কিনে নিতে চাইছে। ফোর্বসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে সিগন্যাল অ্যাপটি হোয়াটসঅ্যাপের চেয়ে নিরাপদ। এটি বলার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারণ বর্তমান, এর মধ্যে একটি হচ্ছে যে এই অ্যাপের স্ক্রিন সিকিউরিটি আছে। ব্যবহারকারীরা গোপনীয়তা সেটিংসে যেতে পারেন এবং সহজেই স্ক্রীন নিরাপত্তা সক্রিয় করতে পারেন, যা মূলত ব্যবহারকারীর ফোনে ব্যবহারকারীর চ্যাটের স্ক্রিনশট নেওয়া থেকে অপর জনকে বাঁধা প্রদান করবে। তাই এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো ভাবেই একজন ব্যবহারকারীর সিগন্যাল অ্যাপের ভেতরে কী কী কার্যকলাপ হচ্ছে সেটি বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সিগন্যাল অ্যাপটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে যে আপাতত কোন বিজ্ঞাপন এই অ্যাপে থাকবে না। তবে শুরুতে হোয়াটসঅ্যাপেরও তাদের ব্যবহারকারীদের কাছে একই প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপকে অধিগ্রহণ করার পর তা বদলে যায়।

এছাড়াও যেহেতু এই অ্যাপ বার্তা প্রেরকদের মেটাডাটা লুকিয়ে রাখে , তাই সিগন্যাল অ্যাপ থেকে বার্তা হ্যাক করা ভীষন ভাবে কঠিন। এমন যদি ধরেও নেওয়া যায় যে কেউ একটি বার্তা ধরে ফেললো কিন্তু বার্তাটি যেহেতু এনক্রিপটেড থাকে তাই বার্তাটিকে ধরতে পারলেও সেটিকে পড়া অসম্ভব। উপরন্তু, মেটাডাটা লুকানো মানে মূল বার্তার অবস্থানও অনুপস্থিত। সুতরাং এই ক্ষেত্রে বলাই যায় এই সিগন্যাল অ্যাপটি বহু ক্ষেত্রেই বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত।

সিগন্যাল অ্যাপটিও কী ফেসবুকের আয়ত্তাধীন?

না, এই অ্যাপটি কখনোই ফেসবুকের আয়ত্তাধীন নয়। সিগন্যাল অ্যাপের  ওয়েবসাইট অনুসারে, একটি নন-প্রফিট সিগন্যাল ফাউন্ডেশন ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ব্রায়ান অ্যাক্টন’-এর কাছ থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রাথমিক মূলধন নিয়ে এই অ্যাপটি চালু করে। অ্যাকটন একজন আমেরিকান ইন্টারনেট উদ্যোক্তা, যিনি পূর্বে ইয়াহুতে নিযুক্ত ছিলেন এবং (জান কুম-এর সাথে) হোয়াটসঅ্যাপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ফোর্বস (২০২০) অনুসারে, অ্যাকটন বিশ্বের ৮৩৬ তম ধনী ব্যক্তি, যার মোট মূলধন আছে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সিগন্যাল অ্যাপটি কি হোয়াটসঅ্যাপের থেকে ভালো?

সিগন্যাল অ্যাপের মূল আকর্ষন হলো, সিগন্যাল অ্যাপের মাধ্যমে প্রেরিত বার্তাগুলি এনক্রিপ্ট করা থাকে যা নিশ্চিত করা হয়েছে সিগন্যাল অ্যাপের পক্ষ থেকে। যার মানে এই প্ল্যাটফর্মটি থেকে কোনো তৃতীয় পক্ষ কোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বার্তা বা মিডিয়া অ্যাক্সেস করতে পারবে না, অথবা তাদের সার্ভারে সংরক্ষণ করতে পারে না। যদিও হোয়াটসঅ্যাপও তাদের ব্যবহারকারীকে বার্তার জন্য এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রদান করে থাকে, তবে এটি থেকে অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য যেমন আইপি ঠিকানা, গ্রুপ বিস্তারিত এবং স্ট্যাটাস অ্যাক্সেস করা যেতে পারে। হোয়াটসঅ্যাপে কোম্পানি এছাড়াও ক্লাউড-এ সঞ্চিত বার্তা এনক্রিপ্ট করে না। এমনকি টেলিগ্রাম অ্যাপ, যেটি কিনা সিগন্যাল এবং হোয়াটসঅ্যাপের আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী মেসেজিং অ্যাপ সেটিও ব্যবহারকারীর কন্ট্যাক্ট নম্বর এবং ব্যবহারকারী আইডি সঞ্চয় করে থাকে। তবে সিগন্যাল অ্যাপে যদি ব্যবহারকারী বার্তা পাঠানোর পর কোনোকারনে বার্তা না ডেলিভার হয়, তাহলে সেটি সিগন্যাল অ্যাপের ডেটাবেসে কিছু দিনের জন্য সঞ্চিত থাকবে। তবে সঞ্চিত মেসেজও যেহেতু এনক্রিপটেড অবস্থায় থাকবে তাই এটিকে পড়ে ফেলার কোনো আশঙ্কা নেই। সিগন্যাল অ্যাপ এছাড়াও ব্যবহারকারীকে একটি রেজিস্ট্রেশন লক পিন সেট করার অনুমতি দেয়, যা ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল তথ্য সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে। যদি কোন ব্যবহারকারী ডিভাইসটি হারিয়ে ফেলে বা নতুন একটিতে স্থানান্তরিত হয় তাহলে এই লক পিন নম্বরটি প্রোফাইল, সেটিংস, যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। আরেকটি বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে যে সিগন্যাল অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের মত বড় কোন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয়।

আপনার মতামত অবশ্যই আমাদের জানান কমেন্ট সেকশনের মাধ্যমে এবং লাইক ও শেয়ার করে পোস্টটিকে ছড়িয়ে দিন সকলের মাঝে।টেকনোলজি সম্বন্ধিত আরও খবর জানতে চোখ রাখুন টুকিটেকের ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া পেজে। 

আরও পড়ুনঃ নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস ইত্যাদি স্ট্রিমিং সার্ভিসের নেপথ্যের রহস্য এবার হবে উদঘাটন! জেনে নিন বিস্তারিত

Leave a Reply