আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জেনে নিন মহাকাশে বাস করার প্রক্রিয়া!

0
941
International Space Station

বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনে বসবাস করার ব্যাপারটা খুবই সহজ শোনালেও এর শুরুটা কিন্তু এতটা সহজে হয় নি। ধীরে ধীরে উন্নতির মাধ্যমে আজকের এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে আজকের আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন অথবা ISS। এই বছরের ২রা নভেম্বরেই সেই আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের হলো ২০ বছর পূর্তি। বিশ বছর ধরে আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন হয়ে এসেছে সারা বিশ্বে মহাকাশচারীদের পৃথিবীর বাইরের বাসস্থান।

পৃথিবীর বাইরে থেকেও কীভাবে জীবন নির্বাহ করা যায় এই কুড়িটি বছর ধরে তাই শিখিয়ে আসছে এই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন। ISS অথবা আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন ২৫টি স্পেস এজেন্সির এবং সংগঠনের কোলাবোরেশনে তৈরী হয়েছে। এরমধ্যে মোট ১৯টি দেশের ২৪১ জন মহাকাশচারী এই স্পেস ষ্টেশনে থেকে গেছেন। তার মানে হলো এর মধ্যে যতজন মহাকাশচারী মহাকাশ অভিযানে গেছেন তার মধ্যে ৪৩% থেকেছেন এই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনে।

ভবিষ্যতে চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহের ভেতরে আরও জটিল অভিযান চালানোর জন্য তৈরী হচ্ছে সারা বিশ্বের স্পেস সংগঠনগুলো। এই সময়ে পৃথিবীর থেকে বাইরে, এইধরনের ঝুঁকিপূর্ণ, বদ্ধ পরিবেশে থাকার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। স্পেস ষ্টেশন এমন একটি জায়গা যেখানে মহাকাশচারীদের কোনো বিপদ হলে হয়তো তারা সিগন্যাল পাঠাতে পারবেন কিন্তু আপতকালীন কিছু হলে তারা সাথে সাথে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবেন না। প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে তাদের সেখানেই থেকে যেতে হবে।

মহাকাশের বাসিন্দাদের ছোট্ট ইতিহাস

মহাকাশের এই আসল স্পেস ষ্টেশনের আগে এসেছিল মহাকাশে এই ধরনের থাকার জায়গা বানানোর আইডিয়া। প্রথম এই ধরনের বাসস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায় এডওয়ার্ড এভারেট হ্যালে-এর কল্পনায়। ১৮৬৯ সালে তার লেখা ‘Brick Moon’-এ তিনি এই ধরনের কাল্পনিক মহাকাশ বাসস্থানের উল্লেখ করেন যার মধ্যে আছে ১৩টি গোলাকারের থাকার চেম্বার।

এরপরে ১৯২৯ সালে হার্মান নুরডাং-এর থিওরিতে উঠে আসে একটি চাকার মতো আকৃতির স্পেস ষ্টেশনের ভাবনা যেটি ঘুরবে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষন শক্তি উৎপাদন করার জন্য। এই চাকার আকৃতির স্পেস ষ্টেশনের ভাবনাটির সাথে সহমত পোষন করেন রকেট বিজ্ঞানী ওয়ার্নহার ভন ব্র্যাউন ১৯৫০-এর দশকে। এরপর ১৯৬৮ সালে একটি ফিল্ম যার নাম ‘2001: A Space Odyssey’-তে এই ধরনের আকৃতির স্পেস ষ্টেশনই দেখানো হয়।

তবে আসল স্পেস ষ্টেশন যখন তৈরী হলো তখন দেখা গেল গোলক কিংবা চাকার বদলে ব্যবহার করা হলো সিলিন্ডার।

প্রথম স্পেস ষ্টেশন ছিল ১৯৭১ সালে তৈরী USSR-এর Salyut 1। এরপরে Salyut প্রোগ্রামের অন্তর্গত আরও ছয়টি স্পেস ষ্টেশন স্থাপন করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে USA স্থাপন করে তাদের প্রথম স্পেস ষ্টেশন Skylab। এই সমস্ত স্পেস ষ্টেশনের আকার ছিল টিউবের মতো।

১৯৮৬ সালে স্থাপিত হলো সোবিয়েত ষ্টেশন Mir। এটিই প্রথম স্পেস ষ্টেশন যার একটি মধ্যভাগ ছিল এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য মডিউল যোগ করা হয়েছিল।১৯৯৮ সাথে আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের প্রথম মডিউল যখন লঞ্চ করা হয়েছিল তখনো Mir তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থান করছিল।

এরপর ২০০১ সালে Mir-কে নামিয়ে আনা হয় এবং পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ঢোকার সাথে সাথে এটি ধ্বংস হয়ে যায়। আর যেইটুকু অংশ ধ্বংস হয় নি সেটি আশ্রয় নিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশির ৫০০০ মিটারের গভীরে, অতল অন্ধকারে।

বর্তমানে ISS অর্থাৎ আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনে আছে ১৬টি মডিউলঃ চারটি রাশিয়ান, নয়টি US, দুটি জাপানি এবং একটি ইওরোপিয়ান। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনটি ভেতর থেকে পাঁচটি বেডরুমযুক্ত বাড়ির সমান বড়ো এবং এটিতে ৬টি মহাকাশচারী থাকতে পারবে ছয় মাস সময় ধরে।

মহাকাশে জীবনধারণ

১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনের পৃথিবীর চারদিকের মহাকাশ ভ্রমণ করে প্রথম প্রমাণ করেন যে মহাকাশেও জীবণধারণ সম্ভব। তবে পৃথিবীতে জীবনধারণের সাথে মহাকাশে জীবনধারনের একেবারেই কোনো মিল নেই।

সাময়িক স্পেস ষ্টেশনগুলো মাধ্যাকর্ষণ তৈরী করার জন্য ঘোরে না। এখানে ওপরে বা নীচে বলে কোনো বিষয় নেই। যদি কোনো বস্তুকে এখানে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে সেটি শুধুমাত্র ভাসতে থাকবে। প্রত্যেকদিনের সাধারণ কাজকর্ম যেমন জল খাওয়া কিংবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্যও পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়ে।

স্পেস ষ্টেশনের কিছু কিছু জায়গায় কৃত্রিমভাবে বস্তু কিংবা মানুষকে ধরে রেখে তৈরী করা হয় মাধ্যাকর্ষন। হাত কিংবা পা বাঁধার স্ট্র্যাপ, ক্লিপ এবং মানুষ এবং জিনিসপত্রকে ধরে রাখার জন্য ‘ভেলক্রো ডট’ হলো মাধ্যাকর্ষনের জায়গা।

স্পেস ষ্টেশনের রাশিয়ান মডিউলে স্পেস ষ্টেশনের যেই দিকটা পৃথিবীর দিকে মুখ করে আছে সেটি অলিভ গ্রিন রঙ দিয়ে রঙ করা এবং যেই দিকটা পৃথিবীর থেক দূরে সেই দিকটা রঙ করা হয়েছে বেইজ রঙ অর্থাৎ বাদামী হলুদ। এই রঙের বৈপরীত্য মহাকাশচারীকে নিজেদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশ করতে সাহায্য করে।

স্পেস ষ্টেশনে কিন্তু রঙের গুরুত্ব অনেক। যেমন স্কাইল্যাব-এ এতটাই রঙের অভাব যে মহাকাশচারীদের মধ্যে স্পেসষ্টেষনে থাকাকালীন ভীষণ রকমের একঘেয়েমি এসে গেছিল। সেই সময়ে মহাকাশচারীরা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এবং রঙের একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্য তাদের ভিডিও ক্যামেরায় ব্যবহৃত রঙীন কার্ডগুলোকেই নেড়েচেড়ে দেখতেন।

ফিল্মে সাধারণত স্পেস ষ্টেশনগুলোকে অতীব আধুনিক এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখায়। কিন্তু আসল সত্যতা সম্পূর্ণ আলাদা। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন মোটেই অত পরিচ্ছন্ন থাকে না। সেই জায়গা প্রচন্ড আওয়াজযুক্ত, অগোছালো এবং গন্ধযুক্ত হয়। বহুদিন ধরে পরিষ্কার না করার দরুন চারিদিকে খাবারের গুড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এই জায়গাটি একটি অতীব বাজে থাকার জায়গা যেখানে একসাথে অনেকজনকে ভাগাভাগি করে থাকতে হয়। সারাক্ষন এখানে কাজ করে যেতে হয়। কোনো মহাকাশচারীই রাতে শান্তির নিদ্রা লাভ করেন না।

যদিও এর কিছু কিছু অসাধারণ ভালো দিকও আছে। স্পেস ষ্টেশনে বসবাসকারী মহাকাশচারীরা দেখতে পায় এমন দৃশ্য যা কোনো পৃথিবীবাসী কোনোদিনও দেখতে পাবেন না।

এই ছোট্টো বিশ্বের ছোট্ট সমাজ

স্পেস ষ্টেশনে কিন্তু রঙের গুরুত্ব অনেক। যেমন স্কাইল্যাব-এ এতটাই রঙের অভাব যে মহাকাশচারীদের মধ্যে স্পেসষ্টেষনে থাকাকালীন ভীষণ রকমের একঘেয়েমি এসে গেছিল।  সেই সময়ে মহাকাশচারীরা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এবং রঙের একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্য  তাদের ভিডিও ক্যামেরায় ব্যবহৃত রঙীন কার্ডগুলোকেই নেড়েচেড়ে দেখতেন।

Zbezda মডিউলের দেওয়ালে Konstantin Tsiolkovsky এবং Gagarin-এর মতো মহাকাশচারীর রাখা ছবি তাদের নিজেদের বাড়ির সাথে সংযোগকে আরও পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দেয়।

মহাকাশচারীদের একে অপরের সাথে সম্পর্কের মধ্যে খাদ্য দ্রব্য একটি বড়োসড়ো অংশ গ্রহণ করে। স্পেস ষ্টেশনে একত্রিত হওয়া বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মহাকাশচারীরা নিজেদের পছন্দমতো নিজেদের সংস্কৃতির খাদ্যদ্রব্য ভাগ করে নিয়ে নিজেদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।

তবে আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনে সবকিছু অতটাও সহজ এবং আনন্দদায়ক নয়। ২০০৯ সালে অন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের শৌচালয় হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক দ্বন্দের বিষয় এবং তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় US-এর স্পেস শৌচালয়ে রাশিয়ান মহাকাশচারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

স্পেস জগতের এই ছোট্ট সমাজে টেকনোলজি শুধুমাত্র কোনো সাধারন বিষয় নয়। এই পুরো সোসাইটিকে ধরে রাখার একটি মাধ্যম হলো টেকনোলজি।

মহাকাশে বসবাসের ভবিষ্যত কী?

আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন চালানো বিশাল ব্যয়বহুল কাজ। প্রত্যেক বছরে এই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের পেছনে নাসার খরচ পড়ে ৩-৪ বিলিয়ন US ডলার-এর কাছাকাছি এবং অনেকের মতেই এত অর্থ এটির পেছনে খরচ করেও কিছু বিশেষ লাভ নেই। যদি আরও কিছু কমার্শিয়াল বিনিয়োগ না আসে তাহলে হয়তো ২০২৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনকে নামিয়ে নিয়ে আসা হবে Mir-এর মতো।

এরপরের স্পেস অভিজানের বাসস্থান হতে পারে চাঁদের কক্ষপথে। নাসা দ্বারা পরিচালিত একটি স্পেস এজেন্সির দল পরিকল্পনা করেছে ‘The Lunar Gateway Project’। এটি ISS-এর থেকে অনেকটাই ছোটো হবে এবং এটিতে একমাসের জন্য মহাকাশচারীরা বসবাস করবেন।

আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের আদলেই তৈরী করা হয়েছে এটির মডিউল এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এটিকে মহাকাশে স্থাপন করা হবে।

তবে পরবর্তীসময়ে অন্যান্য স্পেস ষ্টেশন গড়ে উঠলেও বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর স্পেস সংস্কৃতির একটি ট্রেন্ড তৈরী করে দিয়েছে এই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন। যা মহাকাশের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা বলেই গণ্য হবে।

আপনার কি মনে হয়?আপনার মতামত অবশ্যই আমাদের জানান কমেন্ট সেকশনের মাধ্যমে এবং লাইক ও শেয়ার করে পোস্টটিকে ছড়িয়ে দিন সকলের মাঝে।টেকনোলজি সম্বন্ধিত আরও খবর জানতে চোখ রাখুন টুকিটেকের ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া পেজে। 

আরও পড়ুনঃ তিনটি ছোটো অনুপ্রেরণামূলক এবং উদ্দীপণামূলক ছোটো গল্প,যা জীবনের উন্নতিতে সাহায্য করবে!

Leave a Reply